শিশুদের নিয়ে হজ
আমাদের জোরালো পরামর্শ: ছোট শিশুদের নিয়ে হজে যাওয়ার পরামর্শ আমরা দিই না। প্রচণ্ড গরম (প্রায়ই ৪৫-৫০° সেলসিয়াস), বিশাল ভিড়, দীর্ঘ হাঁটা, মুযদালিফায় খোলা মাটিতে রাত কাটানো এবং কংকর নিক্ষেপের শারীরিক ধকল ছোট শিশুদের জন্য হজকে সত্যিই বিপজ্জনক করে তোলে। ছোট শিশুরা উল্লেখযোগ্যভাবে মনোযোগও বিঘ্নিত করতে পারে, ফলে জীবনে হয়তো একবারই আসা এই আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতায় বাবা-মা ইবাদতে পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পারেন না। সম্ভব হলে শিশুদের পরিবারের কাছে রেখে তাদের ছাড়াই হজ করুন। একেবারে অন্য কোনো উপায় না থাকলেই কেবল শিশুদের সঙ্গে নিন।
আগে বয়সের নিয়ম যাচাই করুন: সৌদি আরব এখন হজে শিশুদের অংশগ্রহণ সীমিত করেছে। ২০২৫ সালের (১৪৪৬ হিজরি) হজে শিশুদের হজযাত্রীদের সঙ্গে আসার অনুমতিই ছিল না, আর ২০২৬ সালের (১৪৪৭ হিজরি) হজে আন্তর্জাতিক হজযাত্রীদের বয়স কমপক্ষে ১২ বছর হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল (নাগরিক ও বাসিন্দাদের জন্য ১৫ বছর)। অন্য কোনো পরিকল্পনার আগে আপনার দেশের হজ কর্তৃপক্ষ, অপারেটর বা Nusuk Hajj-এর কাছ থেকে চলতি মৌসুমের নিয়ম নিশ্চিত করুন।
তবে আপনার সন্তান যদি বর্তমান নিয়ম পূরণ করে এবং তাকে সঙ্গে নেওয়া ছাড়া আপনার কোনো উপায় না থাকে, তাহলে নিচের নির্দেশনা আপনাকে প্রস্তুতিতে সাহায্য করবে।
শিশুদের হজের ইসলামি বিধান
শিশুর হজ সহিহ এবং সওয়াবযোগ্য, তবে তা ফরজ হজ হিসেবে গণ্য হয় না। শিশু বালেগ হওয়ার পর তাকে ফরজ হজ হিসেবে আবার হজ করতে হবে। এটি সহিহ হওয়ার দলিল সেই হাদিস, যেখানে এক নারী তাঁর শিশুকে উঁচু করে তুলে নবী (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন: “এর জন্য কি হজ আছে?” তিনি বললেন: “হ্যাঁ, আর তোমার জন্য রয়েছে সওয়াব।” (সহিহ মুসলিম ১৩৩৬)। আর বালেগ হওয়ার পর তা আবার করতে হবে - এ বিষয়ে আলেমগণ একমত, যেমনটি তিরমিযি লিপিবদ্ধ করেছেন (হাদিস ৯২৬-এর পরে)।
যে শিশু এখনো ভালো-মন্দ বোঝার বয়সে (মোটামুটি ৭ বছর) পৌঁছায়নি, তার পক্ষ থেকে বাবা বা মা নিয়ত করবেন এবং আমলগুলোতে তাকে পথ দেখাবেন। যে বড় শিশু বোঝে, সে বাবা-মায়ের নির্দেশনায় নিজেই নিয়ত করতে পারে।
শিশুদের নিয়ে হজের ব্যবহারিক পরামর্শ
- প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত রাখুন। শিশুরা বড়দের মতো গতি বা সহনশক্তি বজায় রাখতে পারে না। বাড়তি বিশ্রামের সময় রাখুন এবং সূচি সহজ করার জন্য প্রস্তুত থাকুন।
- তথ্যসহ রিস্টব্যান্ড: আপনার সন্তানের হাতে একটি রিস্টব্যান্ড বা ট্যাগ পরিয়ে দিন, যাতে ইংরেজি ও আরবি দুই ভাষায় আপনার নাম, ফোন নম্বর, হোটেলের নাম ও ট্যুর গ্রুপের নাম লেখা থাকে। সে আলাদা হয়ে গেলে এই তথ্য অত্যন্ত জরুরি। প্রতিদিন আপনার সন্তানের একটি স্পষ্ট ছবি তুলে রাখুন, যাতে সেদিনের পোশাক দেখা যায়।
- তাওয়াফ ও সাঈর জন্য কম ভিড়ের সময় বেছে নিন। সাধারণত গভীর রাত ও ভোর সবচেয়ে ভালো। তাওয়াফের জন্য হারামের ওপরের তলাগুলো ও ছাদেও ভিড় কম থাকে।
- শিশু ছোট হলে তাওয়াফের সময় তাকে কোলে বা বহন করে নিন। ভিড়ের কারণে তাওয়াফে স্ট্রলারের চেয়ে বেবি ক্যারিয়ার (নরম কাঠামোর ক্যারিয়ার বা কাপড়ে জড়ানো ক্যারিয়ার) অনেক ভালো।
- ভিড়ের মধ্যে প্রতিটি শিশুর দায়িত্ব একজন অভিভাবককে দিন। কখনো ধরে নেবেন না যে শিশু অন্য অভিভাবকের কাছে আছে - স্পষ্টভাবে কথা বলে নিন।
ভিড়ে নিরাপত্তা: শিশুদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় হলো হজের স্থানগুলোর মধ্যে যাতায়াত (মিনা থেকে আরাফা, সেখান থেকে মুযদালিফা) এবং জামারাত। শিশুদের কাছে ধরে রাখুন বা কোলে নিন। ভিড়ের সময় ছোট শিশুদের জামারাত সেতুতে নিয়ে যাওয়ার বদলে কংকর নিক্ষেপে প্রতিনিধি ব্যবহারের কথা বিবেচনা করুন।
শিশুদের পানিশূন্যতা রোধ ও সুস্থ রাখা
- শিশুরা বড়দের চেয়ে দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে। তারা তৃষ্ণার্ত নয় বললেও বারবার পানি দিন।
- ডায়রিয়া বা বমির জন্য খাবার স্যালাইন (শিশুদের উপযোগী মাত্রায়) সঙ্গে রাখুন।
- শরীরের সব খোলা অংশে সানস্ক্রিন (SPF ৫০+) লাগান এবং ছাতা বা টুপি দিয়ে ছায়ায় রাখুন।
- সহজে বহনযোগ্য শিশুদের উপযোগী হালকা খাবার সঙ্গে নিন: খেজুর, বাদাম, ক্র্যাকার, শুকনো ফল, সিরিয়াল বার।
- গরমজনিত অবসন্নতার (হিট এক্সহসশন) লক্ষণ খেয়াল রাখুন: নিস্তেজ ভাব, খিটখিটে মেজাজ, লালচে ত্বক, প্রস্রাব না হওয়া। সঙ্গে সঙ্গে ছায়ায় নিয়ে যান এবং শরীর ঠান্ডা করুন।
- যেকোনো ওষুধ (শিশুদের প্যারাসিটামল, অ্যালার্জির ওষুধ ইত্যাদি) গুছিয়ে হাতের কাছে রাখুন।
স্ট্রলার ব্যবহারের সুযোগ
কিছু কিছু জায়গায় স্ট্রলার ব্যবহার করা যায়:
- হারামের চারপাশে: বড় চত্বর ও বাইরের এলাকায় স্ট্রলার চালানো যায়। তবে ব্যস্ত সময়ে মসজিদের ভেতরে স্ট্রলার সাধারণত ব্যবহারোপযোগী নয়। ভিড়ের সময় ফটকের নিরাপত্তাকর্মীরা স্ট্রলার নিয়ে ঢুকতে নাও দিতে পারেন।
- সাঈর জন্য: নিচতলা সমতল এবং স্ট্রলার চালানো যায়, তবে ভিড়ের কারণে কঠিন হয়।
- মিনায়: তাঁবুগুলোর মাঝের রাস্তায় স্ট্রলার চালানো যায়, যদিও কোথাও কোথাও রাস্তা এবড়োখেবড়ো।
- বড় ট্রাভেল সিস্টেমের চেয়ে হালকা, ছোট ভাঁজযোগ্য (আমব্রেলা) স্ট্রলার ভালো। আপনাকে বারবার এটি ভাঁজ করে বহন করতে হবে।
শিশুদের জন্য যা সঙ্গে নেবেন
- শিশুদের ওষুধ (জ্বর কমানোর ওষুধ, অ্যান্টিহিস্টামিন, খাবার স্যালাইন)
- আরামদায়ক, হালকা পোশাক (কয়েক সেট)
- হালকা খাবার ও আবার ভরা যায় এমন পানির বোতল
- অবসর সময়ের জন্য ছোট খেলনা বা রং করার বই (যত কম সম্ভব)
- বেবি ক্যারিয়ার বা স্লিং (৩ বছরের কম বয়সীদের জন্য স্ট্রলারের চেয়ে অনেক বেশি সুবিধাজনক)
- রোদ-টুপি ও শিশুদের মাপের ছাতা
- ওয়েট টিস্যু ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার (প্রচুর)
- প্রয়োজনে ডায়াপার ও ডায়াপার বদলানোর সরঞ্জাম
- বাবা-মায়ের যোগাযোগের তথ্যসহ পরিচয়-রিস্টব্যান্ড
- অচেনা পরিবেশে ঘুমানোর জন্য প্রিয় কোনো জিনিস (ছোট কম্বল বা খেলনা)
পরামর্শ: বড় শিশুদের জন্য অভিজ্ঞতাটিকে অর্থবহ করে তুলুন। বয়স উপযোগী ভাষায় প্রতিটি আমলের অর্থ বুঝিয়ে বলুন। তাদের জমজমের পানি পান করতে এবং নিজেদের দোয়া নিজেরা করতে দিন। এটি তাদের জীবনের সবচেয়ে গঠনমূলক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতাগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।